ক্যাটাগরিসমূহ
শক্তি পীঠ

বৈদ্যনাথ জয়দুর্গা শক্তিপীঠ


No imageবৈদ্যনাথ ভারতবর্ষের ঝাড়খন্ড রাজ্যে অবস্থিত । জায়গাটি পূর্বে সাঁওতাল ভীল এলাকা ছিল। ব্রিটিশ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী যখন থেকে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে লোভের থাবা বাড়ালো- তখন থেকে এই অঞ্চলে সর্ব জাতির লোকের বাস হয়ে গেলো । বৈদ্যনাথ একটি শৈব তীর্থ। দ্বাদশ জ্যোতি লিঙ্গের একটি লিঙ্গ এখানে আছে । সাথে এটা শক্তিপীঠ । বিষ্ণু চক্রে খণ্ডিত মা সতী দেবীর হৃদয় এই স্থানেই পড়েছিল । দেবীর নাম জয়দুর্গা আর ভৈরব হলেন বৈদ্যনাথ । এই লিঙ্গ স্থাপনের কথা শিবপুরান, রামায়নেও পাওয়া যায় । ত্রেতা যুগের ঘটনা । দশানন রাবন ছিলেন পরম শিবভক্ত । তিনি ভাবলেন স্বয়ং শিবকে কৈলাশ থেকে নিয়ে এসে লঙ্কায় প্রতিষ্ঠিত করে নিত্য পূজো করবেন । এতে সে নিজেও দুর্জয় আর অমর হয়ে যাবে । এই ভেবে কৈলাশ আক্রমণ করলেন । কৈলাশে দ্বার পাহারায় রত নন্দী কে ‘ অর্ধ পশু অর্ধ নর’ বলে উপহাস করলে ক্রুদ্ধ নন্দী রাবণকে অভিশাপ দেন- ‘বনের পশু বানর আর মানুষের হাতেই তুমি তোমার লঙ্কা সহিত নাশ হবে।’ একথা শুনে ক্রুদ্ধ রাবন , নন্দীকে তুলে আছড়ে ফেলে দিয়ে কৈলাশ পর্বত কেই তুলে ধরলেন, সাথে সাথে ভগবান মহাদেব বাম চরণের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দ্বারা কৈলাশ পর্বতকে ডাবিয়ে দিলেন। রাবণকে বললেন- ‘আমাকে সন্তুষ্ট করতে চাইলে তপস্যা করো। যুদ্ধ , ক্রোধ করে ঈশ্বর দর্শন হয় না।’ রাবন কঠিন তপস্যা শুরু করলে ভগবান শিব পরীক্ষা নেন । রাবন একে একে নয়টি মাথা বলি দিয়ে পূজো করলেন। অন্তিমে শেষ মাথা বলি দিতে গেলে ভগবান শিব দর্শন দিলেন। বললেন- ‘দশানন তোমার তপস্যায় সন্তুষ্ট । মনোবাসনা ব্যক্ত করো।’ রাবন মহাদেবকে লঙ্গায় নিয়ে রাখার কথা বললেন। মহাদেব অনেক বোঝালেন। চন্দ্রহাস নামক শক্তিশালী এক অস্ত্র দিয়ে রাবণকে অনেক প্রকার সন্তুষ্ট করবার চেষ্টা করলেন। কিন্ত রাবন জেদে অটল। অন্তিমে ভগবান শিব আত্মলিঙ্গ রাবণকে দিয়ে বললেন- “লঙ্কায় গিয়ে আমাকে স্থাপন করো। কিন্তু পথে ভুলেও যদি কোথাও এই আত্মলিঙ্গ ভূমিতে রাখো, তাহলে আমি সেখানেই প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবো।” রাবন সেই শিবলিঙ্গ নিয়ে দিব্য বিমানে চড়ে লঙ্কায় ফিরতে লাগলো। দেবতারা এমনকি ভগবান বিষ্ণু পর্যন্ত চিন্তিত হলেন। কারন ভগবান বিষ্ণু রাম অবতার গ্রহণ করবেন। কিন্তু ভগবান শিব পাপী দের সঙ্গ দেন না। হরি আর হর মিলে এক বুদ্ধি করলেন । বরুণ দেবতা রাবনের উদরে প্রবেশ করলে প্রচণ্ড মূত্রবেগে রাবন বিমান সমেত মাটিতে নামলেন । কাছেপীঠে কেউ ছিল না। শিবলিঙ্গ নিয়ে মুত্র ত্যাগ করা যাবে না। আবার শিবলিঙ্গ মাটিতে রাখাও যাবে না । সেই সময় ভগবান বিষ্ণু এক রাখালের বেশে ( মতান্তরে গণেশ রাখালের বেশে এসেছিলেন ) সেখানে আসলেন। রাবন তাঁকে শিবলিঙ্গ দিয়ে বললেন ধরে রাখতে, শিবলিঙ্গ যেনো কোনো অবস্থাতেই মাটিতে না রাখে। রাবন তখন রাখালের হাতে শিবলিঙ্গ দিয়ে মূত্র ত্যাগ করতে গেলে ভগবান বিষ্ণু সেই লিঙ্গ মাটিতে রেখে স্থাপনা করলেন । ব্রহ্মা এই লিঙ্গের পূজো করেন । দেবতারাও ছিলেন। অপরদিকে রাবন এত মূত্র ত্যাগ করলো যে একটা কুণ্ড হল। সেই কুণ্ডের নাম ‘হরলিজূড়ি’। এখনও সেই কুণ্ড আছে । ফিরে এসে রাবন দেখলো লিঙ্গ মাটিতে স্থাপন হয়েছে। রাখাল আর নেই। রাবন সেই লিঙ্গ তোলার অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলো। রাবনের হাতের আঙ্গুলের ছাপ এখনও সেই লিঙ্গে দেখা যায় ।এই বৈদ্যনাথের নাম বৈজুনাথ। অনেক আগে এখানে বৈজু নামে এক সাঁওতাল বালক থাকতো। সে ব্রাহ্মণ দের বর্ণ প্রথায় অসন্তুষ্ট হয়ে প্রতিদিন ব্রাহ্মণ দের আরাধ্য সেই শিবলিঙ্গে একটা করে আঘাত করে যেতো । একদিন সে আঘাত না করেই খেতে বসেছিল ঘরে। হঠাত মনে হল আজ তো শিবলিঙ্গে আঘাত করা হয় নি । এই ভেবে সে আঘাত করতে গেলো। গিয়ে দেখে সেখানে এক দিব্য পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে । সেই পুরুষ বলল- “ ওহে বালক। দেখো ব্রাহ্মণ রা আমাকে রোজ মনে করে না, অথচ তুমি রোজ আমার কথা ভেবে একবার করে আঘাত করো। আজ নিজের খাওয়া ছেড়ে আমার কথা চিন্তা করে এসেছো। তুমি আমার শেষ্ঠ ভক্ত।” এই বলে মহাদেব নিজ মূর্তি ধরে ভীল বালক কে দর্শন দিয়ে বললেন- “তোমার এই ভক্তিতে আমি তুষ্ট। বর চাও।” ভীল বালক বলল- ‘প্রভু। আমার কোনো কিছুর অভাব নেই । শুধু এইটুকু কৃপা করুন। আমার নামের সাথে যেনো আপনার এই ধামের নাম হয়।’ ভগবান মহেশ্বর তাই বর দিলেন । ভীল বালকের নাম ছিল বৈজু। তাই এই ধামের নাম বৈজুনাথ । আবার মহাদেব বড় বৈদ্য। চিকিৎসা শাস্ত্রের অনেক বিদ্যা তিনি রাবণকে দিয়েছিলেন । তাই তিনি বৈদ্যনাথ । বৈদ্যনাথ ধামের এই মন্দির মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মান সিংহ তৈরী করেন । এখানেই শক্তিপীঠের দেবী দুর্গা মাতা আছেন । এই স্থানে শ্রাবন মাসে বিশাল মেলা বসে। বহু ভক্ত দূর দূর থেকে গঙ্গা জল এনে এখানে সমর্পণ করেন । ভগবান শিব আর ভগবতী আদিশক্তির লীলা সত্যই বিচিত্র । পুরুষ আর প্রকৃতির লীলাখেলা। তারই মাধ্যমে চলছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড । জয় বাবা ভোলানাথ। জয় মা শক্তি ।

( সমাপ্ত। আগামী পর্বে থাকবে নেপালের মহামায়া শক্তিপীঠ )

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.