ক্যাটাগরিসমূহ
শক্তি পীঠ

জালন্ধর শক্তিপীঠ


11351384_475741625926687_3109632880465676884_nএই পীঠ ভারতবর্ষের পাঞ্জাবে। লুধিয়ানা পার করে এই পীঠ যেতে হয় । ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে মা ভগবতী সতীর বাম স্তন জলন্ধরে পতিত হয়েছিল । কালিকাপুরান মতে দেবীর দুটি স্তন্যই এই পীঠে পতিত হয় । এখানে দেবীর নাম ত্রিপুরমালিনী। আর ভৈরবের নাম ভীষণ । তন্ত্রসার গ্রন্থে আছে –

“স্তনং জলন্ধরে মম ভীষণো ভৈরবস্তত্র দেবী ত্রিপুরমালিনী।”

 

ভিন্নমতে দেবীর নাম বিশ্বমুখী । আচার্য শঙ্করের অষ্টাদশ পীঠ বর্ণনায় এই পীঠের নাম পাওয়া যায় । তন্ত্রসার গ্রন্থ মতে চারটি মূল পীঠের কথা বলা হয় । এগুলি হল- ‘জালন্ধর, উড্ডীয়ান, পূর্ণগিরি ও কামরূপ’ । এই শহরের নাম এরূপ হবার কারন আছে । বহু আগে জালন্ধর নামক এক অসুর ছিল । তাঁর স্ত্রী ছিল বৃন্দাদুতি । সেই অসুর ব্রহ্মার কাছে এই বর পেলো- যতদিন তাঁর স্ত্রী বৃন্দার সতীত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে – ততদিন সে মরবে না । এই ভাবে সেই অসুর স্ত্রীর সতীত্ব বলে স্বর্গ- মর্ত- পাতাল দখল করে বসলো । একদা নারদ মুনির কাছে দেবী পার্বতীর রূপের বর্ণনা শুনে- তাঁকে প্রাপ্ত করার আশায় কৈলাশ আক্রমণ করে বসলো । কৈলাশে শিবগণ আর অসুর সৈন্যের মধ্যে মহাযুদ্ধ আরম্ভ হল। কিন্তু মহাদেব কিছুতেই সেই জালন্ধর অসুরকে বধ করতে পারছেন না। কারন বৃন্দার সতীত্ব তেজ অসুরের প্রান রক্ষা করছিল। অবশেষে ভগবান বিষ্ণু জালন্ধর অসুরের ছদ্দবেশে গিয়ে বৃন্দার সতীত্ব ভঙ্গ করলেন । ঠিক সেই সময় ভগবান শিব ত্রিশূলে জালন্ধর অসুরের মস্তক ছেদন করে বধ করলেন । বৃন্দা পড়ে সত্যতা জেনে ভগবান বিষ্ণুকে শিলা হবার অভিশাপ দেন, নিজে দেহ ত্যাগ করে পরজন্মে তুলসী দেবী রূপে জন্ম নেন । আবার আর একটি মত শোনা যায়- ভগবান বিষ্ণু দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে দিয়ে জালন্ধর অসুরের মৃত মায়াবী শরীর গঠন করে বৃন্দাকে দেখালে বৃন্দা বিধবা হয়েছে ভেবে শাঁখা সিঁদুর পরিত্যাগ করে সতী ধর্ম বিসর্জন করেন। তখন জালন্ধর অসুরের বধ হয় । ভগবান বিষ্ণু বৃন্দার সতীত্ব কেন হরণ করেছেন- তাঁর ব্যাখা বিভিন্ন পুরানে আছে । বৃন্দা দেবী দেবলোকে থাকতেন শাপভ্রষ্ট হয়ে অসুর কূলে জন্ম নেন। কিছু পুরান বলে মা লক্ষ্মীর সেবিকা ছিলেন বৃন্দা। একদা বৈকুন্ঠে বৃন্দা ভগবান বিষ্ণুকে পতি রূপে কামনা করেছিলেন, এই শুনে মা লক্ষ্মী তাঁকে অসুর কূলে জন্মানোর শাপ দেন । কিছু পুরান মতে মা সরস্বতীর অভিশাপে স্বয়ং দেবী লক্ষ্মী বৃন্দা রূপে জন্ম নেন । আবার গণেশ পুরান মতে একদা তুলসী দেবী গণেশকে বিবাহ করার জন্য ক্রমশ বাধ্য করতে থাকলে গণেশের অভিশাপে তুলসী দেবী অসুর কূলে জন্ম নেন । আর ভগবান বিষ্ণুকে বৃন্দা শাপ দিয়েছিলেন। পড়ে শাপ ফিরিয়ে নিলে আংশিক রূপে শিলাতে পরিণত হন ভগবান বিষ্ণু। তাঁকেই শালগ্রাম বলা হয় । জালন্ধর অসুরকে সমাধি দেওয়া হয়েছিল এই ত্রিপুরমালিনী পীঠে । ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান মতে সমাধি দেবার সময় অসুরের মাথা ছিল বিপাশা নদীর উত্তর দিকে। মুখ ছিল জ্বালা মুখী পীঠের দিকে, শতুদ্র ও বিপাশা নদীর মধ্যে অসুরের পৃষ্ঠ দেশ ছিল। ত্রিপুরমালিনী দেবীর মন্দির বেশ সুন্দর। মন্দিরের প্রবেশ পথে একটি কুণ্ড। সেখানে মা বৈষ্ণবী দেবীর মন্দির । এই মন্দিরে পরিক্রমা করবার নিয়ম আছে । সামনে দেবী ত্রিপুরমালিনী মন্দির । মন্দিরের ডান পাশে ভৈরব মন্দির । স্থানীয় লোকেরা এই ভৈরবকে কালভৈরব বলে ডাকেন । মন্দিরে একটি করে প্রদীপ সকলকেই দিতে হয় । মন্দিরের সামনেই ডালা কিনবার দোকানে পূজার দ্রব্য কিনতে পাওয়া যায় । মন্দির গর্ভে লক্ষ্মী, সরস্বতী, মা বৈষ্ণবীর তিনটি মূর্তি আছে। মন্দিরের পাশে ঢাকা একটা ঘরে মায়ের শয্যা স্থান। দুপুরের ভোগের পড়ে বলা হয়- মা সেখানে বিশ্রাম গ্রহণ করেন । এই পীঠের কাছে তীর্থ যাত্রীদের জন্য বিশ্রামাগার, চিকিৎসালয় আছে । সুতরাং নিশ্চিন্তে এখানে যাত্রা করা যায়। ভারতচন্দ্র অন্নদা মঙ্গল কাব্যে লিখেছেন-

“ জালন্ধরে তাঁহার পড়িল এক স্তন । ত্রিপুরমালিনী দেবী ভৈরব ভীষণ ।।”

ছবিটি সেই ত্রিপুরমালিনী দেবীর । মায়ের চরণে অসংখ্য প্রনাম জানাই ।
( সমাপ্ত । আগামী পর্বে থাকবে বৈদ্যনাথ জয়দুর্গা শক্তিপীঠ )

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.