ক্যাটাগরিসমূহ
শক্তি পীঠ

জ্বালামুখী শক্তিপীঠ(তৃতীয় পর্ব )


soktipithমুঘল সম্রাট আকবর দেবীর মন্দিরে একটি সোনার ছাতা দিয়েছিলেন। কারন কি ? আসুন দেবীর অপাড় লীলা মহিমা শুনি। বহুকাল আগে ভারতবর্ষে তখন মুঘল রাজ ছিল। সেই সময়ের কথা । ধ্যানু নামের একজন পরম মাতৃভক্ত ব্যাক্তি ছিলেন । তিনি সর্বদা মায়ের নাম জপ করতেন । এমন মাতৃভক্ত প্রায় বিরল । একদা ধ্যানু ভাবলেন মা জ্বালা দেবীকে দর্শন করতে যাবেন । সেই সময় ট্রেন, বাস, বিমান তো ছিল না। গো শকট , টাঙ্গা, নৌকা ছিল যাতায়াতের মাধ্যম । আর ছিল পদব্রজে যাত্রা । তাও যাত্রা পথ সুরক্ষিত ছিল না। একদিকে যেমন ছিল বন্য জন্তুর উৎপাত, অপরদিকে ডাকাত দের উৎপাত ছিল। তাই তীর্থ যাত্রার সময় প্রচুর লোক একত্রে যেতো, লোক বেশী থাকলে ডাকাত রা লুঠপাট চালাতে সাহস পেতো না। ধ্যানুর সাথে প্রায় এক হাজার তীর্থযাত্রী তীর্থে চলল । ওঁ চিহ্ন পতাকা, জয় মাতা দি লেখা পতাকা ভক্তদের হাতে উড়লো । দুর্গা মাতা কি জয়, কালী মাতা কি জয়, জ্বালা মাতা কি জয়- বলতে বলতে তীর্থযাত্রীরা জ্বালা পীঠের উদ্দেশ্যে চলল। মায়ের ধামে যাত্রা করার নিয়ম আছে। অনবরত মায়ের নামে জয়ধ্বনি করার প্রথা দেখা যায়। কিন্তু দেশে তখন মুঘল শাসন। হিন্দু নির্যাতন ছিল প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা । মুঘল সেনারা এত তীর্থ যাত্রী, ওঁ পতাকা, মা দুর্গার পতাকা, মায়ের জয়ধ্বনি দেখে ভাবল এঁরা নিশ্চয়ই মুঘল সাম্রাজ্যের নামে ষড়যন্ত্র করবার জন্য একত্রিত হয়ে যাচ্ছে। মুঘল সেনারা সব তীর্থযাত্রী দের বন্দী করে সম্রাট আকবরের কাছে নিয়ে গেলো। বাদশা আকবর তাঁর সেনাদের কাছে সব শুনলেন । বাদশা বললেন – “ওহে ধ্যানু । তোমার সাহস তো মন্দ নয়। তুমি এত লোক জড়ো করে মুঘল সাম্রাজ্যের বিরূদ্ধে চক্রান্ত করছ? জানো এর শাস্তি কি?” ধ্যানু বাদশাহকে প্রনাম জানালো। হিন্দু রীতিতে রাজাকে প্রনাম করবার নিয়ম করা আছে । এর পর ধ্যানু নির্ভয়ে বলল- “জাহাপানা। আমি আপনার বিরূদ্ধে কোনরূপ চক্রান্ত করিনি। আমরা নির্দোষ। আমরা সকলে জ্বালা দেবী দর্শনে যাচ্ছি। আপনার সেনারা ভুল সন্দেহ করে আমাদের আটক করেছে।” বাদশা আকবর জুয়ালা দেবীর নাম শুনে বললেন- “তোমাদের সেই দেবীর মহিমা কি?” ভক্ত ধ্যানু বললেন-“ দেবীর সামনে একটি অগ্নিশিখা আপনেই প্রজ্বলিত থাকে, সেখানেই ভক্তেরা পূজো করেন, সেই শিখা নেভে না।” সব শুনে জাহাপানা হেসে বললেন- “তাই যদি হয়, আমি এখুনি একটি ঘোড়ার মুণ্ডচ্ছেদ করবো, তোমাদের দেবী যদি জাগ্রতা হন- তাহলে সেই ঘোড়াকে জীবিত করে দেখান দেখি। তারপর মানবো।” ধ্যানু বলল- “জাহাপানা আপনি একমাস সময় দিন, আপনি একমাস সেই মৃত ঘোড়াটির দেহ সংরক্ষণ করুন। মায়ের কৃপায় সব সম্ভব।” বাদশা আকবর একটি ঘোড়ার মুণ্ডচ্ছেদ করে তার শরীর তেলে ডুবিয়ে রেখে ও ঔষধ পত্র দ্বারা দেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে ধ্যানু ও ১০০০ তীর্থযাত্রীকে মুক্তি দিলেন । ধ্যানু সেই তীর্থযাত্রী দের নিয়ে জ্বালা পীঠে এসে মায়ের কাছে জ্বালা শক্তিপীঠে পৌছালো । প্রত্যহ ধ্যানু দেবীর কাছে প্রার্থনা করতেন যে মৃত ঘোড়াটিকে প্রান দান করার জন্য, কিন্তু দেবীর দেখা পান না। একদা ধ্যানু ভাবল, মা যদি দর্শন না দেন, তাহলে এই প্রান আর রাখবো না। এই বলে ধ্যানু মায়ের সামনে প্রান ত্যাগ করতে উদ্যোগী হলে, মা জ্বালা দেবী প্রকট হলেন। মায়ের দিব্য স্বরূপ দেখে ধ্যানুর জীবন ধন্য হল। বহু প্রকারে মায়ের স্তব স্তুতি করলেন । মা বললেন- “ ধ্যানু, তুমি বাদশার কাছে যাও, দেখবে অশ্বটি জীবিত হয়ে গেছে।” ধ্যানু বাদশা আকবরের কাছে গেলো। বাদশা আকবর দেখলেন সত্যই অশ্ব জীবিত হয়ে হেটেচলে বেড়াচ্ছে। একী স্বপ্ন না সত্যি ! বাদশা আকবর মা জ্বালা কে মেনে একদিন জ্বালা পীঠে আসলেন । বাদশা আকবর আসছেন শুনে সেখানে সাজো সাজো রব পড়লো । বাদশা আকবর মন্দিরে এসে জলন্ত অগ্নি শিখা দেখলেন । গোঁড়া উলেমা ও মৌলবাদীরা বাদশা আকবরকে কুবুদ্ধি দিল- মন্দিরের সামনের ঝর্নার বাঁক মন্দিরের দিকে মাটি কেটে ঘুরিয়ে দিতে, এতে মন্দিরে জল ঢুকবে। জলের মধ্যেও যদি অগ্নি শিখা জ্বলে থাকে তাহলে বোঝা যাবে দেবীর মহিমা কত ? বাদশা আকবর তাই হুকুম দিলেন। মন্দিরের পূজারী, সেখানকার স্থানীয় হিন্দু রাজা বাদশা আকবরের কাছে অনেক মিনতি করলেন। স্থানীয় রাজা যুদ্ধ করতে সাহস
পাচ্ছিল্লেন না। কারন সেনা কম, আর বাদশা রেগে গেলে কামান দিয়ে গোটা মন্দির গুঁড়িয়ে দিতে পারেন । সেনারা ঝর্নার সামনের মাটি কেটে বাঁক ঘুরিয়ে দিলো। মন্দিরে হুহু করে জল ঢুকে জলে ভর্তি হল। আশ্চর্য জলের মধ্যেও অগ্নি শিখা দিব্যি জ্বলে আছে। নেভে নি। গোঁড়া উলেমা আর মৌলবাদীদের মুখে ঝামা ঘষা হল । বাদশা আকবর দেবীর মহিমা মেনে নিলেন । বাদশা নিজে ধ্যানু ভক্তের অনেক সুখ্যাতি করে মন্দিরে একটি সোনার ছাতা দান করলেন ।
( চলবে। এই পীঠ একটু বড় ।একদিনে সমস্ত লেখা সম্ভব নয় )

5 replies on “জ্বালামুখী শক্তিপীঠ(তৃতীয় পর্ব )”

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.