ক্যাটাগরিসমূহ
শক্তি পীঠ

জ্বালামুখী শক্তিপীঠ(প্রথম পর্ব )


soktipithজ্বালা মুখী অর্থাৎ অগ্নির রূপ । অগ্নি রূপা শক্তি হল দেবীর প্রচণ্ডা রূপ । চন্ডা, প্রচণ্ডা, উগ্রচণ্ডা, চণ্ডনায়িকা সব মায়ের এক একটি প্রকাশ । দেবীর প্রচণ্ডা শক্তি হলেন জ্বালাদেবী। স্থানীয় লোকের ভাষায় একে ‘জুয়ালা মা’ বলা হয় । আবার জুয়ালা মা বলে এক দেবীর নাম পাওয়া যায় । তিনি মা বৈষ্ণবীর একটি রূপ। অবাঙ্গালী হিন্দুরা অষ্টভুজা ভগবতীকে বৈষ্ণবী, দুর্গা ভবানী মা রূপে পূজা করেন । বহু আগে ভারতবর্ষের জন্মুতে হংসালি নামে এক গ্রাম ছিল। সেই গ্রামের মুখিয়া ( বর্তমান ভাষায় পঞ্চায়েত প্রধান ) ছিল সুনন্দ । সে ছিল ধার্মিক, সৎ, নিষ্ঠাবান, দয়াময়, পরের উপকার করতো। কিন্তু তার স্ত্রী সবিতা ছিল হিংসুক, কুচুটে, দেব দ্বিজে সম্মান করতো না । সুনন্দের এক ভাই ছিল। তাঁর নাম শ্রীধর । শ্রীধর তার দাদার মতোই সরল সাধাসিধে মাতৃভক্ত ছিল । গ্রামের বৈষ্ণবী মায়ের মন্দিরে ভজন কীর্তন করতো। সেই গ্রামের পাহাড়ের গুহায় ভৈরব নাথ নামে এক দুষ্ট তান্ত্রিক ছিল। সে বহু কালাযাদুর শক্তিতে অনেক অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিল। একদা সে ফরমান দিল- গ্রামে সকল রকম পূজা পাঠ নিষেধ। যে পূজা করবে, তাঁকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে । একমাত্র ভৈরবনাথ কেই পূজা করতে হবে । প্রানের ভয়ে সাধারন লোকেরা তাই করতে লাগলো। কেউ কেউ আবার সেই গ্রাম ছেড়ে পালালো । মন্দির বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভক্ত শ্রীধর একটি মাতৃ মূর্তি এনে ঘরে বসে পূজা করতে লাগলো । এদেখে তার কুটিল বৌদি বলল- “ওহে তুমি ভৈরবনাথের আদেশ শোনোনি ? তুমি এখানে বসে পূজা করছ- ভৈরবনাথ জানলে তিনি তোমাকে তো শেষ করবেন- উপরন্তু আমরাও তোমার জন্য মারা পড়বো।” শ্রীধর বলল- “বৌঠান। আমি মায়ের পূজো ত্যাগ করতে পারবো না।” এতে সবিতা ক্রুদ্ধ হয়ে বলল- “তবে তুমি কি চাও- তোমার জন্য আমরা মরি?” । শ্রীধর কথা না বাড়িয়ে মায়ের বিগ্রহ নিয়ে বাড়ী ছেড়ে চলে গেলো । কুটিল বৌদির উদ্দেশ্য ছিল সম্পত্তি থেকে বেদখল করা শ্রীধর কে । বাড়ী ছেড়ে শ্রীধর এক কুটির বানিয়ে অন্যত্র থাকতে লাগলো। ইতিমধ্যে তার সুনয়না নামক এক সুন্দরী কন্যার সাথে বিবাহ হল। সুনয়না খুব মায়ের ভক্ত । একদা শ্রীধর মাকে প্রসন্ন করবার জন্য নয় কন্যার পূজার আয়োজন কর। নয় কন্যা হল- মায়ের নয়টি রূপ। নব দুর্গা । কিন্তু ভৈরবনাথের ভয়ে কোনো গ্রামবাসী তাদের কন্যাকে পাঠালো না। শেষে শ্রীধর অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে গ্রামবাসী দের রাজী করাল । গরীব শ্রীধর অনেক কষ্টে পূজোর দ্রব্য জোগার করে আনলো । দুষ্ট ভৈরবনাথ সব জেনে তাঁর আসুরী শক্তি দ্বারা শ্রীধরের পূজার সব সামগ্রী নষ্ট করে দিলো । গ্রামবাসী দের শাসিয়ে গেলো- এরপর কেউ শ্রীধর কে সাহায্য করলে তার কপালে অশেষ দুঃখ আছে । জগৎজননী আদিশক্তি সব দেখছিলেন। তিনি হনুমান কে দূত করে পাঠালেন। হনুমান এসে প্রথমে ভৈরবনাথকে জানালো- “তুমি যদি তোমার দুষ্ট বুদ্ধি পরিত্যাগ করে ধর্ম পথে যদি না আসো- তবে মা ভবানী তোমার নাশ করবেন ।” ভৈরবনাথ গর্বে এত মত্ত ছিল, পাত্তাই দিলো না। এরপর হনুমান সাধু রূপে শ্রীধরের গৃহে গিয়ে জানালো, পুনরায় তুমি নয় কন্যা পূজোর আয়োজন করো। মা তোমার সাথেই আছেন । গরীব শ্রীধর অতি কষ্টে আবার পূজার সব জিনিষ জোগার করলো । কিন্তু ভৈরবনাথের ভয়ে কেউ আর নিজের মেয়েকে পাঠাতে রাজী নয় । উপায় কি ? মা চণ্ডী সব দেখছিলেন । তিনি নব দুর্গা রূপ ধরলেন । শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুস্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী, সিদ্ধিদাত্রী- ইত্যাদি দেবীর রূপ ধরলেন। ৯ দেবী ৯ বালিকার রূপ ধরে শ্রীধরের যখন গৃহে আসলেন- তখন ঊর্ধ্ব আকাশে দেবতা, গন্ধর্ব, নারদাদি মুনি গন করজোড়ে মায়ের বন্দনা করছিলেন । ব্রহ্মা- বিষ্ণু- মহেশ এমনকি হনুমান জী মুনি রূপে এসে মায়ের প্রসাদ গ্রহণ করলেন। যাওয়ার সময় কন্যা গণ বললেন- “হে শ্রীধর, তোমার মঙ্গল হোক। তোমাদের সেবায় আমরা প্রসন্না। তুমি অবিলম্বে মায়ের নামে একটি ভাণ্ডারা  এর আয়োজন করো। গ্রামের সব লোক, এমনকি দুষ্ট ভৈরবনাথ কেও আমন্ত্রণ জানাবে। চিন্তা কোরো না। মা সব ব্যবস্থা করবেন।” শ্রীধর তাই করলো । উৎসবের দিন সকলে আসলো শ্রীধরের গৃহে। দুষ্ট ভৈরবনাথ তার রাক্ষস মায়াবী শিষ্য দের নিয়ে আসলো । এত লোক। কিন্তু প্রসাদ কই ? হঠাত শ্রীধর আর তার স্ত্রী সুনয়না দেখলো এক দিব্য বালিকা কোথার থেকে আসলো। তার সাথে অনেক অনুচর । সবার হাতে ঝুড়ি ঝুড়ি প্রসাদ। আর এক আশ্চর্য কাণ্ড হল। শ্রীধরের গৃহ ছোটো। কিন্তু গ্রাম শুদ্ধ লোক এটে গেলো । সকলে বসে মায়ের প্রসাদ পেতে লাগলো । এই সময় ভৈরবনাথের নির্দেশে তার রাক্ষস শিষ্যরা উৎপাত শুরু করলেই জুয়ালা নামক এক দেবীর আবির্ভাব হয়। তিনি অগ্নিবর্ণা, ত্রিনয়না, দ্বিভুজা, প্রচণ্ড তেজ যুক্তা । তিনি অগ্নি দ্বারা ভৈরবনাথের রাক্ষস শিষ্য দের ভস্ম করলেন । আর সেই দিব্য বালিকা তিনি স্বয়ং মা বৈষ্ণবী। তিনি ভৈরবনাথকে বধ করলেন। এই বধের লীলাতে মায়ের একটি ধাম প্রতিষ্ঠা হয় । সেটা অন্য কোনো পর্বে বলা হবে । আজ এইটুকুই থাক।

( চলবে )

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.